সাকীফার ঘটনা
সাকীফার ঘটনার বর্ণনা দাও?
সাকীফা বনু সায়েদা’র ঘটনা মহানবি (স.)-এর ইন্তেকালের পর এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছিল। মুহাজিরীন ও আনসারদের একটি দল ইমাম আলী (আ.) এবং প্রসিদ্ধ সাহাবীদের অনুপস্থিতিতে সাকীফা বনু সায়েদায় সমবেত হন এবং অনেক ঝগড়াঝাটির পর আবু বকরকে খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করেন। তারা দ্রুতই বিভিন্ন পদ্ধতিতে অন্যদের থেকে বাইয়াত আদায় করে আবু বকরের খিলাফতকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
সাকীফার অবস্থান
সাকীফা বনু সায়েদার অবস্থান ছিল মসজিদে নব্বির উত্তর পশ্চিম দিকে। হিজরতের পূর্বে এটি ছিল আনসারদের (মদীনার লোকজন যেমন আউস ও খাযরাজ) পরামর্শসভার স্থান।[১] অভিধানিক অর্থে সাকীফা বলতে বুঝায় ছাদ বিশিষ্ট বারান্দাকে (ছায়া যুক্ত স্থান) মনে করা হয়।[২]
মহনবি (স.)-এর স্থলাভিষিক্ততার জন্য সাকীফায় সমাবেশ
মহানবি (স.)-এর ওফাতের পর যখন ইমাম আলী (আ.) এবং বনি হাশিমের লোকজন তাঁর (স.) গোসল ও দাফন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন তখন আনসার ও মুহাজিরদের একটি দল জানেশীন নির্ধারণের জন্য বনু সাকীফায় সমবেত হন।
সাকীফায় উপস্থিত হওয়া ব্যক্তিরা তাদের নিজেদের দলকে অন্য দল অপেক্ষা অধিকতর যোগ্য মনে করতেন। আনসাররা ঈমান আনয়ন ও মহানবিকে (স.) সহযোগিতা করার বিষয়টিকে স্থলাভিষিক্ততার ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকারের দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেন। উত্তরসূরীর ক্ষেত্রে মুহাজিররাও নিজেদেরকে আগে ইসলাম গ্রহণকারী ও মহানবি (স.)-এর আত্মীয়তার সম্পর্কের জেরে অগ্রগণ্য হিসেবে তুলে ধরেন।মুহাজিরদের বক্তব্য শোনার পর আনসাররা – আমাদের থেকে এক আমীর এবং মুহাজিরদের থেকে এক আমীর- এমন মত উপস্থাপন করেন। কিন্তু আবু বকর, রাসূলের (স.) স্থলাভিষিক্ত কুরাইশদের ভিতর থেকে হবে-মহানবি (স.) হতে বর্ণিত এ সংক্রান্ত একটি হাদীস তুলে ধরে তাদের মতটি প্রত্যাখ্যান করেন।[৩]
আনসাররা যারা কিনা সা’দ ইবনে উবাদে’র নেতৃত্ব কামনা করছিলেন তারা পরাজিত হন এবং পরিশেষে উমর ইবনে খাত্তাবের পরামর্শে আবু বকরের খিলাফতের বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছান এবং সঙ্গে সঙ্গে তার নিকট বাইয়াত করেন এবং উপস্থিত হওয়া লোকজনের অধিকাংশই তাদেরকে পথ অনুসরণ করেন। কেউ কেউ মনে করেন আউস ও খাযরাজদের মধ্যের দীর্ঘদিনের শত্রুতাও মুহাজিরদের এগিয়ে রাখতে ভূমিকা রেখেছিল।[৪]
জনগণের নিকট হতে বাইয়াত আদায়
তারা সাকীফা বনু সায়েদা থেকে বের হওয়ার পর বিভিন্ন প্দ্ধতিতে অন্যদের নিকট হতে আবু বকরের পক্ষে বাইয়াত গ্রহণ করেন এবং তাদের মোকাবিলায় ইমাম আলী (আ.), হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) এবং মহানবি (স.) এর কিছু কিছু সাহাবীর প্রচেষ্টা বিফল হয় এবং আবু বকরের খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলমানদের কিছু সংখ্যক এই বাহানায় যে, মুসলিম জমায়েতের বিরোধিতা করা যাবে না, বাইয়াত করতে বাধ্য হন এবং খিলাফত হরণকারীরা ছলে, বলে, কৌশলে, হুমকি, ধামকি, হত্যা, মিথ্যা ও বানোয়াট হাদীসের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যে অধিকাংশের বাইয়াত গ্রহণে সক্ষম হন। বাইয়াতকারীদের মধ্য হতে কেউ কেউ অনীহার সহিত ও বাধ্য হয়ে আবু বকরের প্রতি বাইয়াত করেন।[৫]
এই নির্বাচনে ইমাম আলী (আ.) এবং বনু হাশিম গোত্র, আনসার ও মুহাজিরগণের মধ্যে প্রসিদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অনেকেই যেমন, মহানবির (স.) চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব, সালমান, মিকদাদ, আম্মার, আবুযার প্রভৃতি উপস্থিত ছিলেন না। হযরত ফাতেমা (সা.আ.) অত্যন্ত রাগান্বিত ও ক্ষুব্ধভাবে ফিলাফত সংক্রান্ত এ ধরনের পথভ্রষ্টতা সম্পর্কে কুরাইশ নারীদের জবাবে বলেন:
- ”তোমাদের দুনিয়ার প্রতি আমি মনক্ষুন্ন এবং বিচ্ছিন্নতায় খুশি, কারণ আমাদের হক আদায় করো নি এবং মহানবির (স.) সাথে করা শপথ ও অঙ্গিকার রক্ষা করা হয় নি এবং তাঁর অসিয়ত মান্য করা হয় নি…”
কেউ কেউ বিশ্বাস করেন আবু বকর ও উমর ইবনে খাত্তাব কর্তৃক খিলাফত হরণ করার কারণে মানুষ মহানবির (স.) আহলে বাইত দূরে সরে গেছেন এবং এর ফলশ্রুতিতে অপ্রত্যাশিত প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে আলী (আ.) আইম্মা আতহারগণের (আ.) যথাযথ পদক্ষেপ ও চিন্তাচেতনা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করেছে।[৬]
তথ্যসূত্র
- ↑ হাসানি, আলী আকবর, তারিখে তাহলিলি ওয়া সিয়াসি ইসলাম আজ জাহিলিয়াত তা আসরে উমাভি, নাশরে ফারহাঙ্গ, প্রথম সংস্করণ, ১৩৭৩ হিজরি, পৃষ্ঠা ৩১৯।
- ↑ শহীদি, সাইয়িদ জাফর, তারিখে তাহলিলি ইসলাম, তেহরান, মারকাজে নাশরে দানেশগাহি, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩৬৩ হিজরি, পৃষ্ঠা ৯১।
- ↑ শহীদি, সাইয়িদ জাফর, তারিখে তাহলিলি ইসলাম, তেহরান, মারকাজে নাশরে দানেশগাহি, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩৬৩ হিজরি, পৃষ্ঠা ৯২।
- ↑ শহীদি, সাইয়িদ জাফর, তারিখে তাহলিলি ইসলাম, তেহরান, মারকাজে নাশরে দানেশগাহি, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩৬৩ হিজরি, পৃষ্ঠা ৯২।
- ↑ রশাদ, আলী আকবর, দানিশনামায়ে ইমাম আলী (আ.), তেহরান, ফারহাঙ্গ ওয়া আন্দিশায়ে ইসলামি, ১৩৮০ হিজরি, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৪০৫ ও ৪৫৫।
- ↑ হাসানি, আলী আকবর, তারিখে তাহলিলি সিয়াসি ইসলাম, নাশরে ফারহাঙ্গ, প্রথম সংস্করণ, ১৩৭৩ হিজরি, পৃষ্ঠা ৩২১।